পদাতিক কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on telegram
Share on reddit
Share on twitter

সূচনা

কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের জীবন শেষ হয়ে গেল গত ৮ই জুলাই,২০০৩-এর ভোরে। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর।তিনি ‘পদাতিক কবি’ নামে পরিচিত ছিলেন। রয়ে গেল তার অমর সাহিত্য কীর্তি। বাংলা সাহিত্যে বিশেষ করে কবিতায় সুভাষ মুখোপাধ্যায় নামটি ছিল বিশেষ পরিচিত। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাঁর কবিতায় বাংলা ভাষাকে, বাংলা কথা কে, সাধারণ মানুষের আর্ত বেদনাকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। শঙ্খ ঘোষের কথায়, “তার লেখায় মানবজাতির অবস্থার গভীর দিকটা ফুটিয়ে তুলেছেন”। তার এই কথা মধ্য দিয়েই তার জীবন বোধ, রাজনীতি, সামাজিক অস্তিত্ব ফুটে উঠেছে। তাঁর সাহিত্যের লাইনে আগে মানুষ, পরে সব। আগে জীবন, পরে তত্ত্ব। আগে স্বদেশ, পরে সাহিত্য। কবি জীবনবোধের এই ধারাকে যদি সামান্য অনুধাবন করা যায় তাহলে আমরা বুঝতে পারব যে, বাংলা সাহিত্য জগতে ওঁর স্থান কতটা রিক্ত হলো। তাঁর প্রয়াণ কালের সন্ধিক্ষণে এই পদাতিক কবি জীবন ও কাব্য সম্পর্কে আমাদের একান্ত আলোচনা করা দরকার।।

জন্ম ও শিক্ষা

কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯১১ সালের ১২ ই ফেব্রুয়ারি নদীয়া জেলার সদর কৃষ্ণনগরে। তাঁর পিতার নাম ছিল ক্ষিতীশ চন্দ্র মুখোপাধ্যায়, মাতার নাম ছিল জানকীবালা দেবী। কবি পৈতৃক বাড়ি ছিল বর্তমান বাংলাদেশের কুষ্ঠিয়ার লোকনাথ পুরে। তিনি ১১ বৎসর বয়সে কলকাতায় চলে আসে এবং কলকাতার মিত্র ইনস্টিটিউশন থেকে ম‍্যাট্রিক পরীক্ষা দেন। শেষ পর্যন্ত তিনি ১৯১৪ সালে স্কচিশচার্চ কলেজ থেকে দর্শনে সাম্মানিক স্নাতক হন। প্রথাগত শিক্ষার এখানেই কবির শেষ হয়েছিল।

কর্ম ও সাহিত্য জীবন

কবি কোনোদিন কোথাও স্থায়ী চাকরি করেননি। তিনি কেবল মাত্র লিখেই জীবিকা অর্জন করতেন। এবং তার সাথে করেছেন রাজনীতি। তিনি ছাত্র জীবনেই পুরোপুরিভাবে বামপন্থী রাজনীতি গোষ্ঠীর মধ্যে নিজেকে উৎসর্গ করে দেয়। তখনকার আদর্শ কমিউনিস্ট পার্টি, যার জন্য তাঁকে ১৯৪২ সালে একবার এবং ১৯৪৮ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত আর একবার কারাবাস করতে হয়েছিল। তিনি নিজেকে নিজের জীবনের বাইরে থেকে লেখার মধ্যে উৎসর্গ করেছিলেন। ১৯৪০ অর্থাৎ তাঁর কারাবাসের আগে তাঁর লেখা প্রথম কবিতা ‘পদাতিক’ বেরিয়েছিল। তিনি কেবল কবিতা লিখতেন না, অনেক উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ ও লিখেছিলেন। তার মধ্যেই তার কিছু বহুল পরিচিত কবিতাগুলি ছিল অগ্নিকোণ, চিত্রকূট, কাল মধুমাস, একটু পা চালিয়ে ভাই ,ধর্মের কল ,কাব্য সংগ্রহ প্রভৃতি। তার বিখ্যাত উপন্যাস গুলির মধ্যে হলো হাংরাস, অন্তরীপ, ইয়াসিনের কলকাতা, কে কোথায় যায় প্রভৃতি ।কবির শিশু সাহিত্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বই গুলি হল আমার বাঙ্গালা, সেদিন জলে জঙ্গলে, নিজে লিখি নিজে পড়ি ইত্যাদি।

পার্টির মুখপত্র থাকাকালীন তিনি ‘জনযুদ্ধ’ এবং ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেছেন, প্রুফ দেখেছেন,এমনকি হকারি ও করেছিলেন ।কিন্তু তিনি লেখাকেই শুধুমাত্র আর মৃত্যু সঙ্গী করে নিয়েছিলেন। তিনি বিখ্যাত পত্রিকা ‘পরিচয়’ ও ‘বাঙালির ইতিহাস’ ও সম্পাদনার কাজ করেছিলেন। তিনি সত্যজিৎ রায় ও লীলা মজুমদারের সাথে যুগ্মভাবে ‘সন্দেশ’ পত্রিকা সম্পাদনা করেছিলেন। অনুবাদ সাহিত্যে ও তিনিই যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তাঁর অনুদিত সাহিত্য গুলির মধ্যে ‘গাথা সপ্তশতী’, ‘অমরুশ তক’, ‘পাবলো নেরুদার কবিতা’ প্রভৃতি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তাঁর প্রধান দিকদর্শক ভ্রমণ সাহিত্য হল ‘ভিয়েতনামে কিছুদিন’ অন্যতম। বিজ্ঞাপন জগতেও ছিল তার অবাধ প্রতিপত্তি। তিনি বিজ্ঞাপনকেও সাহিত্যের পূর্ণরসে ডুবিয়ে এক অনন্যসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দিয়েছিলেন। তাঁর রচিত অনবদ্য বিজ্ঞাপনের মধ্যে ‘মুখে দিলে গলে যায়, আহারে কি পুষ্টি’, ‘সাদাকে করে ধবধবে সাদা’, ‘শুদ্ধশুচি সুস্থ রুচির’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। কবিতা, ভ্রমণকাহিনী, উপন্যাস, অনুবাদ সাহিত্য, পত্রিকা সম্পাদন ইত্যাদি সকল সাহিত্য জগতে তার অবাধ পদচারণা বাংলা সাহিত্যকে বহুবর্ণ মন্ডিত করেছে।

সাহিত্যকীর্তির জন্য সম্মান

তিনি তাঁর দীর্ঘ জীবনের সাহিত্যকর্মের জন্য আনন্দ পুরস্কার, রবীন্দ্র আকাদেমি পুরস্কার, জ্ঞানপীঠ পুরস্কার, কালিদাস সম্মান, কুমারুণ পুরস্কার, মধ্যপ্রদেশ সরকার থেকে প্রাপ্ত কবীর সম্মান প্রভৃতি বিশিষ্ট সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন।

উপসংহার

আধুনিক বাংলা কবিতার জগতে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় শুধু নায়কই নয়, তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল যে তিনি বাংলা ভাষা কে, বাংলা কথা কে, সাধারণ মানুষের কথাকে তিনি নিজের কবিতার ভাষায় প্রকাশ করেছিলেন। যদিও অনেকে তাঁকে ‘বিপ্লবী কবি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলন। তবুও তিনি প্রথমে মানুষকে ভালোবাসতে শিখেছিলেন। কারন প্রথমে তিনি নিজের জীবনকে ভালবাসতে শিখেছিলেন। বিদ্রোহ, বিপ্লব যা ছিল সেই ভালোবাসার একটি অংশমাত্র। তত্ত্ব বা আদর্শের যে ভালবাসাই ছিল তাঁর কাছে সবচেয়ে বড়। তাই তাঁর সাহিত্যে স্পষ্টতাও সাহসিকতার অধিক পরিচয় পাওয়া যায়। কিন্তু আজ তিনি আর আমাদের মধ্যে জীবিত নেই। তিনি যথেষ্ট করেছেন সবার জন্যে চুরাশি বছর ধরে সাহিত্যজগতে অনবরত পদচারণা করে তিনি আমাদেরকে এই বিংশ শতাব্দীর দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছেন। যা যা দায়, কর্তব‍্য বাকি রইল, তা আমাদের সম্পন্ন করতে হবে।

Share on facebook
Share on whatsapp
Share on telegram
Share on reddit
Share on twitter
Scroll to Top